আজ ঠাকুর রামকৃষ্ণর জন্মতিথি, তাই সবার আলোচনার কেন্দ্রে পরমহংস আর তাঁর অগুনতি কার্যকলাপ; সাথে বিবেকানন্দ সহ বাকি শিষ্যরা। এই সময়ে একটু অন্যদিকে চোখ রাখি। লোকমুখে আর বিবেকানন্দের মাধ্যমে ঠাকুরের মাহাত্ম্য ছড়ালেও একজনের অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, যাঁকে সবাই মাস্টার মশাই বলেই ডাকতেন – যিনি শ্রীম নাম নিয়ে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃতর মতো পাঁচ খন্ডের এক প্রামাণ্য দলিল রেখে দিয়ে গেছিলেন ভাবীকালের জন্য। রামকৃষ্ণ – বিবেকানন্দের মন্ত্রে দীক্ষিত কোনো বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিল যিনি এই বই পড়েন নি। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে জানতে হলে এই বই ছাড়া আর উপায় নেই।
সবার আড়ালে থাকা বিস্মৃতপ্রায় মাস্টার মশাইয়ের জীবনপঞ্জিতে একটু উঁকি মারা যাক তাহলে।
বদ্যিকূলে এখনো যে কয়েকজন পুরোনো মানুষ বেঁচে আছেন, তাদের থেকে যেটুকু জানা গেলো, মহেন্দ্রনাথ স্কুলজীবনে পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিলেন। হেয়ার স্কুল আর প্রেসিডেন্সি কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বেশি কিছুদিন ব্রিটিশ সরকারের অফিসে কাজও করেছিলেন। পরবর্তীতে নিজেই পড়াতে শুরু করলেন ইংরেজি, ইকোনমিক্স এর মতো বিষয় আর আস্তে আস্তে সংস্কৃত কলেজের প্রধান শিক্ষকও হয়েছিলেন।
কেশব সেনের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়কে বিয়ে করার সুবাদে অনেক বছর ধরেই মহেন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম সমাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। যৌথ সংসারের যাঁতাকলে পড়ে নানান কারণে যখন যুবক মহেন্দ্রনাথ একপ্রকার সুইসাইড করবেন বলে মনস্থ করে ফেলেছেন, ঠিক সেই সময়ে এইরকমই এক ফেব্রুয়ারী মাসে তার সাথে দক্ষিনেশ্বরে সাক্ষাৎ হলো স্বয়ং ঠাকুর রামকৃষ্ণের। সম্পর্কের সেই শুরু আর যার শেষ হয়েছিল কথামৃতের পাঁচটি খন্ডের মাধ্যমে।
কথায় বলে, গুণী মানুষের শিষ্যের অভাব হয় না। মহেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। রামকৃষ্ণের সাথে সাথেই তিনি পেয়েছিলেন পরমহংস যোগানন্দকে। মুকুন্দ ঘোষ, যিনি মহেন্দ্রনাথের এক ঘনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন, পরবর্তীকালে যোগানন্দ নাম গোটা ভারতে এমনকি বিদেশেও সমাদৃত হন। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি বিদেশে গিয়ে ভারতীয় যোগ সাধনাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন। Autobigraphy of a Yogi বইটার নাম আমরা সবাই শুনেছি, যোগানন্দের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি এই বই। একটা পুরো চ্যাপ্টার বরাদ্দ আছে মাস্টার মশাই মহেন্দ্রনাথের নামে। গুরুর প্রতি শিষ্যের শ্রদ্ধা আর সম্মান প্রতিটি ছত্রে প্রতিফলিত হয়েছে সেখানে।
ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির উল্টোদিকে ঝামাপুকুরের যে বাড়িতে মাস্টার মশাই থাকতেন সেখানে স্বয়ং সারদা মা দুর্গাঘট প্রতিষ্ঠা করে এসেছিলেন, সাথে ঠাকুর রামকৃষ্ণের একটি ছবি। দোতলার কোণের ঘরে এক মাস ছিলেনও। পরে এই ঘরে বসেই শ্রীম তার কথামৃত লেখা শেষ করেন, বিবেকানন্দও অনেকবার সপার্ষদ এই বাড়িতে এসে মহেন্দ্রনাথের সাথে আলোচনা করে গেছেন। বাড়িটি এখন কথামৃত ভবন নামেই পরিচিত, যদিও জীবনের শেষ নয়-দশ মাস মহেন্দ্রনাথ এই বাড়িতে থাকেন নি, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কলকাতা থেকে বেশ দূরে, মিহিজামে।
রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দের পরিমণ্ডলে নাহয় বাকিদেরকেও মানুষ একটু শ্রদ্ধা নিবেদন করুক।