আজ নাটকের দিন – বিশ্ব নাট্য দিবস। চারপাশে অনেক সভা আর আলোচনা চলবে সারা দিন ধরে। সেগুলো শোনার বা অংশগ্রহণের আগে চলুন একটু ঘুরে আসি থিয়েটারের প্রথম দিকের দিনগুলো থেকে।
নাটকের উৎস: আচার, ধর্ম ও মানব অভিজ্ঞতা
নাটক তুমি কার – এই বিতর্ক আজকের নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নাটকের উৎপত্তি একে অপরের থেকে ভিন্ন হলেও একটি বিষয় কিন্তু স্পষ্ট যে প্রায় সব ক্ষেত্রেই নাট্যকলার সূচনা হয়েছে ধর্মীয় আচার, পৌরাণিক কাহিনি এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।পরবর্তীকালে এই আচারভিত্তিক উপস্থাপনাগুলিই ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে সুসংগঠিত নাট্যপ্রদর্শনে।
সেদিক থেকে দেখলে, মিশরের Abydos Passion কে বিশ্বের প্রাচীনতম নাট্যরূপ হিসেবে ধরা হয়। এটি ছিল এক ধর্মীয় নাট্যানুষ্ঠান, যেখানে দেবতা Osiris এর জীবন, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের কাহিনি উপস্থাপিত করা হতো। এই নাটকটি মূলত মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হতো এবং এতে অংশগ্রহণ করতেন পুরোহিত ও সাধারণ মানুষ। এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক সংগঠিত নাট্যরূপ, যেখানে চরিত্র, কাহিনি এবং প্রতীকী অভিনয়ের সমন্বয় বেশ ভালোভাবেই দেখা যায়।

প্রাচীন গ্রিক থিয়েটার: আধুনিক নাটকের ভিত্তি
মিশরের নাটককে যদি শুরু বলে ধরেও নেওয়া হয় তাহলে আধুনিক নাটকের জনক কিন্তু নিঃসন্দেহে গ্রীস। খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৪ সালে Thespis প্রথমবারের মতো কোরাস থেকে আলাদা হয়ে একক অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেন, যা নাটকের ইতিহাসে এক বিপ্লবী পরিবর্তন। এই ঘটনাই “অভিনেতা” ধারণার সূচনা করে যা পূর্বে ছিল না। আর প্রথম সম্পূর্ণ সংরক্ষিত নাটকের কথা যদি বলেন তাহলে সেটা হলো The Persians (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭২), যা Aeschylus রচনা করেন এবং পারস্য যুদ্ধের কাহিনি তুলে ধরে।
প্রাচীন গ্রিসে এইসময় নাট্যকলার সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত বিকাশ ঘটে, যা আধুনিক পাশ্চাত্য নাটকের ভিত্তি স্থাপন করে দেয়। বিশেষত এথেন্স শহরে নাটক ধর্মীয় উৎসবের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। Dionysus দেবতার সম্মানে আয়োজিত উৎসবগুলিতে নাটক মঞ্চস্থ হতো, এবং এই উৎসবগুলিই নাটকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সময়েই ট্র্যাজেডি, কমেডি এবং স্যাটায়ার এই তিনটি প্রধান নাট্যধারার জন্ম হয়। গ্রিক নাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক এবং দার্শনিক আলোচনার এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। চরিত্র নির্মাণ, প্লটের বিন্যাস এবং নাট্যরীতির বহু আধুনিক ধারণা এই সময় থেকেই বিকশিত হয়।

ভারতীয় নাটকের উদ্ভব: সংস্কৃত নাট্য ও নাট্যশাস্ত্র
ভারতেও নাটকের উৎপত্তি বেশ পুরোনো। বৈদিক যুগের (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০) বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সংলাপ ও অভিনয়ের উপাদান দেখা যেত। পরবর্তীকালে পতঞ্জলির মহাভাষ্যতেও (প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১৪০) নাটকের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা সংগঠিত নাট্যচর্চারই প্রমাণ। ভারতীয় নাট্যকলার মূল ভিত্তি হলো নাট্যশাস্ত্র যা নাট্যকলার একটি বিস্তৃত তত্ত্বভিত্তিক গ্রন্থ হিসেবে আজও স্বীকৃত। এতে অভিনয়, সংগীত, নৃত্য, মঞ্চসজ্জা এবং দর্শকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। সংস্কৃত নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ধর্মীয় ও নৈতিক দিক, পাশাপাশি রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা। এই নাট্যধারায় পেশাদার নাট্যদলের উপস্থিতি এবং নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। এই সময়ে কালিদাস, ভাসা এবং ভবভূতির মতো নাট্যকাররা অসাধারণ সাহিত্যকর্ম রচনা করেন, যা ভারতীয় নাট্যকলাকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করে তোলে।

এশিয়ার অন্যান্য নাট্যধারা
ধীরে ধীরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নাটকের নিজস্ব স্বতন্ত্র রূপ গড়ে ওঠে, যা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন। ভারত এবং অন্যান্য দেশ ছাড়াও চিনকে পাওয়া যায় যাদের প্রাচীন নাট্যরূপগুলির মধ্যে Dawu Dance অন্যতম, যা সাং রাজবংশের পতনের কাহিনি তুলে ধরে। এটি ছিল একধরনের নৃত্যনাট্য, যেখানে কাহিনি, সংগীত এবং প্রতীকী উপস্থাপনার সমন্বয় ঘটেছিল। পরবর্তীকালে সং রাজবংশে “Mulian Rescues His Mother” নাটকটি দীর্ঘ আকারের প্রথম চীনা নাটক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। চীনে Beijing Opera এক অনন্য নাট্যরীতি হিসেবে বিকশিত হয়, যেখানে সংগীত, অভিনয় এবং মার্শাল আর্টের সমন্বয় দেখা যায়। জাপানে নো এবং কাবুকি নাটক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; নো নাটক ধীর, প্রতীকী এবং দার্শনিক, আর কাবুকি নাটক বর্ণাঢ্য, প্রাণবন্ত এবং সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে খুব তাড়াতাড়ি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একসময় ছায়ানাট্যের প্রচলন ছিল, যেখানে আলো ও ছায়ার মাধ্যমে ধর্মীয় ও পৌরাণিক কাহিনি উপস্থাপন করা হতো। এই সব ধারাই প্রমাণ করে যে নাটক প্রতিটি সমাজে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হলেও এর মূল উদ্দেশ্য বিভিন্নরূপে মানব অভিজ্ঞতার প্রকাশ।

মধ্যযুগীয় ইউরোপ: ধর্ম থেকে নাটকের পুনর্জন্ম
অন্যদিকে রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে নাট্যকলার পুনর্জাগরণ ঘটে ধর্মীয় পরিসরে। Hrosvitha নামক এক সন্ন্যাসিনী ছয়টি নাটক রচনা করেন, তার মধ্যে ভীষণ জনপ্রিয় একটি হলো “Abraham” ও “Dulcitius”। এগুলি মধ্যযুগীয় ইউরোপের প্রথম উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত। ইংল্যান্ডে ধর্মীয় নাটকের প্রচলন থাকলেও ১৫৭৬ সালে James Burbage “The Theatre” নামে প্রথম স্থায়ী বাণিজ্যিক নাট্যমঞ্চ নির্মাণ করেন। এটি আধুনিক থিয়েটার শিল্পের বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। “Le Jeu d’Adam” ফ্রান্সের প্রথম দিকের নাটকগুলির মধ্যে অন্যতম, যা গির্জার বাইরে মঞ্চস্থ হয়েছিল এবং স্থানীয় ভাষায় সংলাপ ব্যবহার করেছিল। এটি ধর্মীয় নাটক থেকে সেক্যুলার নাটকের দিকে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নির্দেশ করে। আমেরিকায় প্রথম নাট্যপ্রদর্শন হিসেবে ধরা হয় “El Juicio Final”, যা ১৫৩৮ সালে Tlatelolco তে মঞ্চস্থ হয়। এটি Nahuatl ভাষায় রচিত ছিল এবং খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকরা স্থানীয় জনগণকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করতেন।

মধ্যযুগে ইউরোপীয় নাট্যকলার প্রধান কেন্দ্র ছিল বিভিন্ন চার্চ। এই সময়ে নাটক মূলত ধর্মীয় কাহিনির উপর ভিত্তি করে নির্মিত হতো, যা সাধারণ মানুষের কাছে বাইবেলের গল্পগুলি সহজভাবে তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। Mystery Plays এবং Morality Plays এই সময়ে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাটক চার্চের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে জনজীবনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়। এর ফলে নাটকের বিষয়বস্তু ও রীতিতে বৈচিত্র্য দেখা দেয়।

রেনেসাঁ ও আধুনিক থিয়েটারের উত্থান
রেনেসাঁ যুগে নাট্যকলায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে, যা আধুনিক থিয়েটারের ভিত্তি স্থাপন করে। এই সময়ে মানবতাবাদী চিন্তার বিকাশ ঘটে এবং নাটকে বাস্তব জীবনের প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডে শেক্সপীয়ার নাট্যকলাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর রচিত ট্র্যাজেডি, কমেডি এবং ঐতিহাসিক নাটক আজও বিশ্বজুড়ে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর কাজ নাট্যরীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং চরিত্র ও কাহিনির গভীরতায় এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে।
আধুনিক যুগের নাটক দিনে দিনে আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। বাস্তববাদ, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের বিষয়গুলি নাটকের কেন্দ্রে চলে এসেছে অনেকদিন। নাটক এখন কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়; এটি সমাজের অসঙ্গতি, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। পরীক্ষামূলক মঞ্চায়ন, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অভিনয়ের নতুন ধারা নাট্যকলাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

তাহলে এটা বোঝা যায় যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নাটকের সূচনা ভিন্ন সময়ে এবং ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও একটি সাধারণ সূত্র স্পষ্ট যে নাটক মানুষের জীবন, বিশ্বাস এবং সমাজকে প্রতিফলিত করে এসেছিলো এবং আজও সেটাই করে চলে। প্রাচীন ধর্মীয় আচার থেকে শুরু করে আধুনিক মঞ্চ পর্যন্ত এই যাত্রা প্রমাণ করে যে নাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানবসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল। বিশ্বের বিভিন্ন নাট্যধারায় পার্থক্য থাকলেও কিছু মৌলিক উপাদান সর্বত্রই বিদ্যমান। অভিনয়, নাট্যপাঠ, মঞ্চ এবং দর্শক – এই চারটি উপাদানের সমন্বয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ নাট্য অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়। অভিনয় নাটকের প্রাণ, নাট্যপাঠ তার কাঠামো নির্ধারণ করে, মঞ্চ তার ভৌত রূপ প্রদান করে এবং দর্শক সেই অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণতা দেয়। এই উপাদানগুলির সমন্বয়েই নাটক একটি জীবন্ত শিল্পরূপে পরিণত হয়।
কেন থিয়েটার আজও প্রাসঙ্গিক?
আজকের এই ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির পরেও থিয়েটারের গুরুত্ব কমে যায়নি; বরং এটি নতুন মাত্রা অর্জন করেছে। থিয়েটার দর্শকদের একটি সরাসরি এবং জীবন্ত অভিজ্ঞতা প্রদান করে, যা অন্য কোনো মাধ্যম সহজে দিতে পারে না। এটি মানুষের মধ্যে গভীর আবেগীয় সংযোগ সৃষ্টি করে এবং সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। পাশাপাশি এটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্ব নাট্য দিবস: একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন
নাটকের ইতিহাস আসলে মানুষের ইতিহাসেরই প্রতিফলন। প্রাচীন ধর্মীয় আচার থেকে আধুনিক পরীক্ষামূলক মঞ্চ পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রা মানুষের সৃজনশীলতা, অনুভূতি এবং আত্মপ্রকাশের এক অনন্য উদাহরণ। বিশ্ব নাট্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নাটক কোনো এক দেশের সম্পদ নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির এক যৌথ ঐতিহ্য। এই দিনটি নাট্যশিল্পীদের অবদানকে স্বীকৃতি জানায় এবং বিশ্বজুড়ে সংস্কৃতির বিনিময়কে উৎসাহিত করে। বিশ্ব নাট্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মঞ্চ কেবল একটি কাঠামো নয়; এটি মানুষের হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে জীবনের গল্প বারবার নতুনভাবে বলা হয়।
১৯৬২ সালে International Theatre Institute এর উদ্যোগে শুরু হওয়া বিশ্ব নাট্য দিবস প্রত্যেক ২৭শে মার্চ একটাই অঙ্গীকার নিয়ে চলে – নাট্যকলার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা এবং শিল্প – সংস্কৃতির মাধ্যমে মানবিক সংযোগকে আরো শক্তিশালী করা।

Discover more from Saikat Gupta
Subscribe to get the latest posts sent to your email.