অথ চণ্ডাল কথা 

সকাল থেকেই আকাশটা গুম মেরে আছে, থমথমে চারদিকে। ভোরের দিকে বেশ জোরে যে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে সেটা এখন চারপাশটা দেখে মালুম হচ্ছে। আজ কলেজ যাওয়ার কোনো চান্স নেই, তার ওপর সকাল সকাল শুনে ফেলেছি যে মাকে বলছে বাবা, আজ তাহলে একটু বাজারের দিকে যাই। আর আমি খুব ভালো জানি যে বাবা আজ গঙ্গার ইলিশ নিয়েই তবে আসবে। আমি অবশ্য কিছু না বোঝার ভান করে জানলা দিয়ে আকাশটা বেশ কয়েকবার দেখার পর মাকে শুনিয়ে বোন বুল্টিকে বললাম – যাই রে, একটু সদর দরজার বাইরে গিয়ে বৃষ্টির হালটা দেখে আসি; মনে তো হয় না আজ কলেজ যেতে পারবো। 

উদ্দেশ্য, চায়ের দোকানে একটু উঁকি মারা আর বাকিরা কি করছে সেটা একটু বুঝে নেওয়া। আমাকে চায়ের ঠেক অব্দি যেতে হয়নি, গলির মোড় থেকেই চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। জোর পায়ে দৌড়ে গিয়ে দেখি, গলার শিরা ফুলিয়ে ল্যাংচাদা আমাদের চায়ের দোকানের রবিদাকে এই মারে তো সেই মারে আর মুখ দিয়ে একটাই কথা বেরোচ্ছে – আমি চণ্ডাল? চাঁড়াল? তুই চণ্ডাল, তোর তিন পুরুষ চাঁড়াল।

রেগে গেলে ল্যাংচাদাকে থামানো মুশকিল। কোনোরকমে ল্যাংচাদাকে নিরস্ত করে চায়ের দোকানেরই এক কোণে বসানো হলো। শিবুদা বাজার করে ফিরছিলো, সে দাঁড়িয়ে গেছে; দোকানেই বাদল আর সিধু ছিল – ওরা কিছুতেই থামাতে পারেনি কাউকে। আমি শেষে গিয়ে ওদের নিয়ে আর শিবুদাকে দিয়ে ধমক খাইয়ে তবে শান্ত করি ল্যাংচাদাকে, আর কি!

কিন্তু কি নিয়ে এই ঝামেলা, সেটা তো জানতে হবে। ল্যাংচাদা মুখে কুলুপ গুঁজে বসে আছে, ইংরেজরা যেটাকে বলে স্পিকটি নট। শেষে রবিদাকে অনেক তেল দিয়ে যেটা জানা গেলো, সকালে বাড়িতে আজ চা জোটেনি ল্যাংচাদার। হয় চা আগেই বানানো হয়ে গেছিলো, এই আবগারি ওয়েদারে উনি নিশ্চয়ই পরে ঘুম থেকে উঠেছেন বা অন্য কোনো কারণে চা হয়তো বাড়িতে বানানোই হয়নি। এদিকে মোড়ের মাথায় এসে দেখে রবিদা তখনো দোকান খোলেনি। জল কাদা পেরিয়ে সবে এসে পৌঁছেছে রবিদা। তাঁকে দেখে নাকি ল্যাংচাদা প্রথম থেকেই বৈভব সূর্য্যবংশীর মতো ব্যাট মানে মুখ চালানো শুরু করে। রবিদা এমনি মানুষটি শান্ত প্রকৃতির, কিন্তু রেগে গেলে সামলানো মুশকিল।  প্রথমে বাবা-বাছা বলে কাজ না হওয়ায় রবিদা শুধু বলার মধ্যে বলেছে – তোমার কেন এমন চণ্ডালের মতো রাগ। ব্যাস, আগুনে ঘি পরে গেছে। তারপর তো আমি নিজের কানেই শুনলাম ল্যাংচাদা কি বলছে। 

ল্যাংচাদার রাগ কমানোর গুরুমন্ত্র আমি জানি – এক কাপ চিনিছাড়া লাল চা আর সাথে ঠিক দুটো বিস্কুট – একটা লম্বু আর একটা পটল বিস্কুট। সবকিছু নিয়ে বসলাম ল্যাংচাদার সামনে একটা কোণায়। আমায় দেখেই বললো – শুনলি তো, রবি আমায় চণ্ডাল বলেছে। আমি ব্যানার্জী বামুনের ছেলে, মহালয়াতে গঙ্গায় আবক্ষ নিমজ্জিত হয়ে পিতৃপুরুষের প্রতি তর্পন করি আর আমায় বলে কিনা চণ্ডাল? 

বুঝলাম রাগের কারণ।  কিন্তু ল্যাংচাদা থামলে তো হয়। 

ওই রবির ব্যাটা জানে চণ্ডালের মানে? বিশ্বমিত্র মুনির অভিশাপে হরিশ্চন্দ্রের রাজা থেকে চণ্ডাল হওয়ার গল্প হলেও সত্যিটা একটু শুনিয়ে দিস। বিবেকানন্দের স্পিচটা ১২ই জানুয়ারী আবার চালাস তো। আর আমায় বলে কিনা চণ্ডাল! ও জানে যে চণ্ডাল একটা সংস্কৃত শব্দ যেটা আদতে একটা বংশ? ৮৩১ সালে নান্নুক এই চণ্ডাল বংশ স্থাপনা করেছিল। জানে এসব তোদের রবি? সন্ন্যাসী রাজা সিনেমা তো খুব দেখেছে, জানে কি ওই বাংলাদেশেরই ভাওয়ালে দুই চণ্ডাল ভাই কিছুকাল রাজত্ব করেছিল আর শিক্ষাই ছিলো তাঁদের মূল অস্ত্র? জানিস তোরা কেউ যে ওই সময়ে বর্ণ বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একটা লিপি অব্দি তৈরী করে ফেলেছিলো চণ্ডালরা? তথাকথিত সভ্য সমাজের চাপে সেসব আর বেশিদুর যেতে পারেনি। তোদের রবিও তাই – ওই চা বানিয়ে কাটিয়ে দিক সারা জীবন।

রবি কিছু জানুক আর নাই জানুক, আমি তো খনির সন্ধান পেয়ে গেছি। দৌড়ে বাড়ি থেকে শুধু নোটবইটা আনতে হবে চা শেষ হওয়ার আগে। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ।  

আচ্ছা ল্যাংচাদা, তুমি নান্নুক নিয়ে কি বলছিলে? 

পটল বিস্কুটে কামড় দিয়ে ল্যাংচাদা বললো – চন্ডাল জাতি বা চন্ডাল বংশ ভারতবর্ষে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছে। চন্ডাল জাতি আসলে চতুর্বর্ণের বিরোধী ছিল। তাই তারা চতুর্বর্ণের বাইরেই অবস্থান করতেন। চন্ডালদের ভারতবর্ষের শাসনকাল সবমিলিয়ে প্রায় ৫৬০ বছর। তাদের শাসন অঞ্চল ছিলো গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, আর বঙ্গদেশ মানে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশ। বুঝলি কিছু? ইতিহাস পড়তে শেখ, শুধু হোয়াটস্যাপ করলে হবে না। 

এইরকম বলার মানে আমি জানি। ল্যাংচাদার ভাণ্ডারে আরো মণি মুক্ত আছে – ঠিকঠাক চাকা ঘোরালেই কেল্লা ফতে।

এই যে রবি চণ্ডালের রাগের কথা বললো – এটা সত্যি যে চণ্ডালদার রাগ খুব ভয়ানক ছিলো কিন্তু তার পরের কথাগুলো বল। নাহলে ইতিহাস তো বিকৃত হয়ে যাবে। 

কি সেই ইতিহাস? এবার দেখি রবিদা সব ভুলে প্রশ্ন করছে।

তুমি কি জানো রবি, এই চণ্ডালরা রাগ কমানোর জন্যে অহিংস হয়ে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়েছিল? সেন যুগেও তাঁদের জায়গা ছিলো সমাজের একদম নিচের দিকে। তাই চণ্ডালদের রাগের কথাটা থেকেই গেলো জনমানসে। 

এবার আমাদের দিকে তাকিয়ে – এই যে তোরা এতো বৌদ্ধ ধর্মস্থানে ঘুরতে যাস। জানিস কি, ওদের এক দেবীর নাম চণ্ডালী? গৌরীদেবী বিভাগের সপ্তম দেবী এই চণ্ডালী। তিনি নীল বর্ণা, ডান হাতে অগ্নিকুণ্ড, বাম হাতের তর্জনী স্পর্শ করে আছে নিজের বুক। জানিস কিছু? বৌদ্ধ ধর্মের বজ্রযান সাধকপন্থীদের সাধনমালা ও নিষ্পন্ন যোগাবলী তন্ত্রের পু়ঁথিগুলির মধ্যে বেশ কয়েকবার উল্লেখ আছে দেবী চণ্ডালীর। পারলে এশিয়াটিক সোসাইটিতে গিয়ে পরে নিস্। 

জানি না কোন ইতিহাস বই পড়লে এগুলো জানতে পারবো আর ঠিক ততটাই জানি না ল্যাংচাদা কিকরে এতসব কিছু জানে? 

আচ্ছা এখানে তো অনেকেই জড়ো হয়েছেন দেখছি, ওহ জহর দাদুও আছে দেখছি! সবজান্তা ওই শিবুটা নেই? ডেকে নিয়ে আয় ব্যাটাকে – খুব তো আমায় তখন জ্ঞান দিচ্ছিলো – বলুক দেখি তো, রামায়ণে কোন চণ্ডালের কথা বলা আছে?

এটা আমাকেও ভাবাচ্ছে – বন্ধুসমাজে একটু বেশি জানি বলে কদর আছে, তবে এটা তো আমিও জানি না। 

কথিত আছে, যখন রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা কোনো এক গুহক চণ্ডালের বাড়িতে আতিথ্য নিলেন, তখন তাঁদের উড়কি ধানের মুড়কি এবং পানিফলের পায়েস খেতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আনন্দের আতিশয্যে পানীয় জল দিতে বেমালুম ভুল হয়ে গেছিলো। তখন থেকেই নাকি উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের কাছে তাঁদের ছোঁয়া জল অশুচি বলে গণ‍্য হয়ে গেল। তবে যেহেতু শ্রীরামচন্দ্র চণ্ডাল বাড়িতে তাঁদের দেওয়া উড়কি ধানের মুড়কি ও পানিফলের পায়েস খেয়েছিলেন, সেহেতু দুর্গাপুজোয় চণ্ডালদের দেওয়া মুড়কি ও পানিফল নিবেদিত হয়ে থাকে। আজও গ্রামাঞ্চলের অনেক পুজোতে এর চল আছে। 

আপনারা শুনেছেন কেউ এই ছড়া? 

রাম এসেছে, রাম এসেছে, পড়ে গেল সাড়া।

ধা গুড় গুড় বাদ‍্যি বাজে, নাচে চণ্ডাল পাড়া।

আমায় চণ্ডাল বলা! আরো বলি? 

রাঢ় বাংলার চণ্ডালদের মধ্যে চারটে ভাগ আছে – কেশর, নুনে, পানফলে ও কোটাল। বৃত্তি অনুয়ায়ী এই ভাগ – যেমন, কেশরের কারবারীরা কেশর, নুন তৈরি করতেন যাঁরা, তাঁরা নুনে, পানিফলের কারবারীরা পানফলে এবং যাঁরা পাহারাদারের কাজ করতেন, তাঁরা কোটাল।

জানিস? চণ্ডালদের মধ্যে প্রচলিত গোত্রগুলো হলো – কাশ‍্যপ, শাণ্ডিল‍্য, সিঁদ ঋষি, আরো অনেক কিছু। সগোত্রে এঁদের বিয়ে হয় না, চণ্ডালদের মধ্যে কেউ কেউ পৈতে পরে। কেন বলতো? 

উফফ আবার প্রশ্ন।  ল্যাংচাদাই উত্তর দিলো, সেন পর্বের পরে ব্রাহ্মন্যধর্মের সংস্পর্শে এসেছিলো চণ্ডালরা যদিও তখনো তাঁদের স্থান ছিলো সমাজের নিচেই। সেই থেকেই এই ট্রাডিশন চলছে। 

চন্ডালদের মধ্যে ব্রাহ্মণ আছে। তারা বর্ণ ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। তারা চন্ডাল সমাজে পূজা পার্বণ পরিচালনা করেন। তাঁরা বিষ্ণু, মহাদেব এবং নদীর দেবতার পূজা ইত্যাদি ধর্মীয় আচার পালন করে থাকে। চণ্ডালদের মধ্যে মৃতদেহ দাহ করার প্রথা আছে। অশৌচ হয় দশদিন। আর কালীপুজো ও চৈত্র সংক্রান্তির দিন পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করা হয়। তবে এখন সবার মধ্যেই বৃত্তির বদল ঘটছে, তাই চণ্ডাল জাতিও এখন আলোর বৃত্তে আসছে একে একে। 

আজকের এপিসোডটা এখানেই শেষ ভেবে নোটবইটা সবে বন্ধ করেছি, কোথেকে সবজান্তা শিবুদা এসে হাজির। 

হ্যাঁ রে ল্যাংচা, তুম্বুরু বললো তুই নাকি আমার খোঁজ করছিলি? বাজার থেকে সবে এসে একটু চা নিয়ে বসেছি আর শুনি তুই আমার নামে নাকি যা খুশি তাই বলে যাচ্ছিস। বল, বুকের পাটা থাকলে সবার সামনে বল। 

এই রে, আবার ঝামেলা শুরু হলো নাকি? যদিও রবিদা পরের চা দিয়ে দিয়েছে, আমিও পটল বিস্কুট নিয়ে রেডি। 

শিবু, তুই কি জানিস যে চর্যাপদেও চণ্ডাল জাতির প্রমান আছে? 

অন্য কেউ হলে হ্যাঁ বলে পার পাওয়া যেত কিন্তু বাবা এ যে ল্যাংচাদা। হ্যাঁ বললেই প্রশ্ন করবে কত নম্বর পদে কি লেখা আছে!

শিবুদার উত্তরের অপেক্ষা না করেই ল্যাংচাদা বলে চললো –

বাজনাব পাড়ী পঁউআ থাঁলে বাহিউ

অদয় বঙ্গালে ক্লেশ লুড়িউ

আজি ভুসুক বঙ্গালী ভইলী

নিজ ঘরিণী চণ্ডালী লেলী।

অর্থাৎ, পদ্মখালে বাইলাম বজ্রনৌকো, দয়াহীন বঙ্গালে লুটে নিল ক্লেশ। ভুসুক আজ বাঙ্গালী হলো, নিজ গৃহিণী নিলো চণ্ডালী।

আমাকে আজ আর পায় কে! কি ক্ষণে শিবুদা এক ব্রাহ্মণকে নমঃ শূদ্র বানিয়ে ফেলেছিলো সকাল সকাল – তবে না এত কিছু জানলাম। নোটেবুকে লিখে রেখেছি এই ছড়াটাও, সুযোগ বুঝে ভুসুক কবিকেও চিনে নেবো কোনো এক সময়ে।

ওদিকে একটু আগেই বাবাকে দেখেছি বাজার নিয়ে ফিরতে। আমি চললাম ইলিশ মাছ খেতে। আর আপনি?


Discover more from Saikat Gupta

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.