বছর দুয়েক ওড়িশাতে থাকার সুযোগ হয়েছিল কর্মসূত্রে, তাই ভুবনেশ্বর থেকে পুরী ছিল মোটামুটি আমাদের সপ্তাহান্তের ঠিকানা। সমুদ্রের সামনে প্রথম সারির হেন কোনো হোটেল বোধহয় নেই যেখানে আমরা থাকিনি, আর একবার হলেও মন্দির দর্শন ছিল আমাদের কাছে একটা নিয়মের মতো। সারাবছর পুরী আর জগন্নাথ মন্দির একরকম; সেই আবহাওয়াই বদলে যায় রথের সময়ে।
রথযাত্রা মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে তিনটি বিশাল রথ, লাখো ভক্তের ঢল, “জয় জগন্নাথ” ধ্বনি আর মহাপ্রসাদের সুবাস। কিন্তু রথযাত্রার আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন বহু ইতিহাস, প্রতীক, উপজাতীয় সংস্কৃতি, স্থাপত্য, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং লোকবিশ্বাস – যেগুলো সাধারণত প্রচলিত লেখায় স্থান পায় না।
আজ সেই অচেনা জগন্নাথকেই জানার চেষ্টা। এই প্রশ্নগুলো আমার নয়, ওড়িশার আনাচে কানাচে ঘোরাঘুরির সময় স্থানীয় মানুষদের সাথে অনেক গল্প করার ফল।
এক এক করে আজ সেগুলোই সামনে আনছি।
জগন্নাথ কি আদৌ কৃষ্ণের মূর্তি? নাকি আরও প্রাচীন এক দেবতার রূপ?
ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, জগন্নাথের উৎস কেবল বৈষ্ণব ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়। ওড়িশার শবর (সোরা) উপজাতিরা বহু শতাব্দী আগে “কিটুং” নামে কাঠের দেবতার পূজা করতেন। সেই দেবতার বড় বড় গোলাকার চোখ, অসম্পূর্ণ হাত এবং কাঠের দেহ ছিল। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্য একত্রিত হয়ে যে দেবতার সৃষ্টি হয়, তিনি আজকের জগন্নাথ; ভারতীয় ধর্মীয় সমন্বয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক।
কেন তিন ভাইবোনের চোখ এত বড়?
অনেকে বলেন, এটি শিল্পরীতি। কিন্তু প্রাচীন তন্ত্রশাস্ত্রে গোলাকার বিশাল চোখকে বলা হয় “অনন্ত দর্শনের প্রতীক”। এর অর্থ হলো, চোখ কখনও পলক ফেলে না। তিনি সবসময় বিশ্বজগতকে দেখছেন। ঈশ্বরের কাছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একইসঙ্গে দৃশ্যমান। অর্থাৎ জগন্নাথের চোখ কেবল শিল্প নয়, দর্শনের ভাষা।
অসম্পূর্ণ হাত আসলে কি অপূর্ণতা?
জগন্নাথের হাত সম্পূর্ণ নয়। কিন্তু বহু গবেষক মনে করেন, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর মানবতাবাদ। হাত নেই অথচ তিনি সবাইকে আলিঙ্গন করেন। পা নেই কিন্তু তিনি সবার কাছে পৌঁছে যান। এ যেন এক ঈশ্বর যিনি কোনও নির্দিষ্ট রূপে আবদ্ধ নন।
সুভদ্রা কেন একমাত্র নারী, যিনি দুই ভাইয়ের মাঝখানে?
ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যে এমন দৃশ্য অত্যন্ত বিরল। অনেক গবেষক মনে করেন, সুভদ্রা এখানে কেবল কৃষ্ণের বোন নন। তিনি শক্তির প্রতীক। বলরাম প্রতিনিধিত্ব করেন শক্তিকে। জগন্নাথ প্রতিনিধিত্ব করেন চৈতন্যকে। আর মাঝখানে সুভদ্রা হলেন যোগমায়া, যিনি দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেন।
তিনটি রথ আসলে তিনটি দর্শন?
প্রতিটি রথ কেবল বাহন নয়। জগন্নাথের রথ নন্দীঘোষের ১৬টি চাকা। অনেক গবেষক একে মানুষের ১৬টি সংস্কার বা পূর্ণতার ধাপের প্রতীক মনে করেন। তালধ্বজ যা বলরামের রথ বলে পরিচিত তার ১৪টি চাকা। এটাকে চৌদ্দলোক বা চৌদ্দ ভুবনের প্রতীক বলেও ব্যাখ্যা করা হয়। সুভদ্রার রথ দর্পদলন, তার আবার ১২টি চাকা। ১২ মাস, ১২ আদিত্য এবং সময়চক্রের প্রতীক হিসেবে ধরা হয় এটা।
কেন প্রতি বছর নতুন রথ?
বিশ্বে খুব কম ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রতি বছর সম্পূর্ণ নতুন রথ তৈরি হয়। এর দার্শনিক অর্থ হলো,
ঈশ্বর স্থায়ী কিন্তু দেহ হলো অস্থায়ী। রথ বদলায়, যাত্রা বদলায়; কিন্তু যিনি যাত্রী, তিনি একই থাকেন।
রথের একটি পেরেকও লোহার নয়?
পুরীর রথ তৈরিতে ঐতিহ্যগতভাবে কাঠ, দড়ি ও বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যায়। এর পেছনে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, প্রকৌশলগত কারণও রয়েছে যা এই বিশাল কাঠামোকে চলার সময় ধাক্কার অভিঘাত শোষণ করতে সাহায্য করে। শতাব্দী প্রাচীন ভারতীয় কাঠশিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন এটি।
রথযাত্রা কি সূর্যযাত্রার প্রতীক?
কিছু গবেষক মনে করেন, আষাঢ় মাসে সূর্যের অবস্থান, বর্ষার সূচনা এবং কৃষি চক্রের সঙ্গে রথযাত্রার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দেবতার যাত্রা মানেই প্রকৃতির নতুন পর্যায়ে প্রবেশ। এই ব্যাখ্যা লোকসংস্কৃতির সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক অভিনব মেলবন্ধন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দড়ি?
রথ টানার জন্য ব্যবহৃত মোটা দড়ি শুধু কারিগরি দক্ষতার নিদর্শন নয়। লোকবিশ্বাস বলে, দড়ি টানার অর্থ নিজের ভাগ্যকে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করা। তাই অনেকেই দড়ির একটি ছোট অংশ আশীর্বাদ হিসেবে সংরক্ষণ করেন।
‘জগন্নাথ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ?
‘জগৎ’ + ‘নাথ’। কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণে এর আরেকটি ব্যাখ্যা আছে – যিনি কেবল মানুষের নন,
সমস্ত প্রাণী, প্রকৃতি, সময়, মহাকাশ; সবকিছুর অধিপতি। তাই জগন্নাথ কোনও এক ধর্মের দেবতা নন; তিনি এক সর্বজনীন ধারণা।
প্রশ্নগুলো থাকুক, উত্তরও আসবে নানা রকম। এইরকম বৈচিত্র নিয়েই তো জগন্নাথ।
Discover more from Saikat Gupta
Subscribe to get the latest posts sent to your email.